top of page

টুকরো কথা

টুকরো ছবিঃ

একটা গাড়ি, প্রাইভেট কার ইন ঢাকা

গাড়ির ২জন বন্ধু বা সহযাত্রীর আলাপনের টপিকঃ কিভাবে কিছু লোক অবৈধভাবে সব টাকা নিয়ে নিচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত্যের সমস্যা। একটা রিকশা গাড়িটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িচালক খুব ই বিরক্ত হয়ে অনেকটা কাছে চলে যায়। শেষ মূহুর্তে না হলেও কিছুটা ভয় দেখাতে চায় রিকশাটাকে। রিকশাওয়ালা খিচায়ে চিৎকার করে ওঠে, শালার টাকা মেরে গাড়ি কিনসস আবার ফুটানি?

কিছুটা নাদুস লোকটা , যে কিনা আপাত মধ্যবিত্তের ঝুলি থেকে এসেছে, সেও চরম বিরক্তি এবং ঘৃণা নিয়ে তাকায়। কিন্তু কোন কথা বের হয়না মুখ দিয়ে। রিকশাটা তখন ভীড়ের মধ্যে চলে গেল।

(ক্লাসের মদ্ধ্যেও কি কিছুটা এমনই হয়না? মানে সবাই তাঁর সামনের জনটাকে অপছন্দ এবং ঘৃণা করে। তাকে টপকাতে চায়। কিন্তু তাঁর পেছনের জনকে নিয়ে কখনও গোনায় নেয় না। কে জানে? সবাই তো ঠিক। আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলে দেখা যায় সবাই যার যার জায়গায় ঠিক, কারো তো কোন ভুল নেই!)

টপ শটে (ফার্মগেট) রেল ক্রসিংঃ

আমার রিকশাটা ক্রসিঙের রঙ রাস্তাটা ধরে সিগনালের বেশ কাছে চলে আসে। সবাই থেমে গেল। অপেক্ষা করছে একটা ট্রেনের। অজানা এক ট্রেন। বেশ খানিক্ষন পেরিয়ে গেল। মোটামুটি মিনিট দশেক! মানুষজন ইতিউতি চাওয়া শুরু করছে। সব জায়গায় কিছু লোকের যেমন বলার কিছুই থাকেনা, তেমনি কিছু লোকের গলার স্বর বেশ উচ্চকিত হয়। স্বাভাবিক ভাবেই দেশের অরাজকতা এবং ভোগান্তি নিয়ে জনতার মধ্যে আলাপন বেগবান হল। আক্রান্ত হল ক্ষমতার সকল নেতারা। কেউ যায়গা থেকে একটুও নড়লনা বা নড়লেও একটা নির্দিষ্ট গন্ডির ভিতরেই চক্কর খেতে খেতে বরাবর এবং আরো অন্নতকালের জন্য একই অভ্যাসে অপেক্ষা করতে থাকল।

এরপর হঠাত বেশ শ্লথ গতিতে, অনেকটা একটা বিরাট শামুকের মত ট্রেনটা আসতে লাগল এবং অবশেষে একসময় চলেও গেল। চালকগন যার যার যায়গা থেকে প্রানপনে চেষ্টা করতে লাগল একে অপরকে ডিঙ্গীয়ে যাওয়ার। যদিও হলনা। মানুষ তো বায়বীয় কিংবা তরল না, যে পাশাপাশি রাখলে একটা আরেকটার সাথে মিশে যাবে, মানুষ হল অতিকঠিন পদার্থ। ২পাশের লেন দিয়েই একই সময়ে উভয় রাস্তায় আসার কারনে মোটামুটী মুখোমুখি বেঁধে গেল। একেবারে মুক্তিহীন পথ। কোথাও যাওয়ার পথ নেই। এর মধ্যেই দ্বিতীয় ট্রেনের আগমন সূচক তোপদ্ধনি। উপর থেকে কেউ টপ ভিউ দেখলে সে বেশ আনন্দই পেত। বেঁধে গেল ঝগড়া। বেশ একটা টান টান ক্লাইম্যাক্স। ট্রেন লাইনের উপর যানবাহনের জগাখিচুড়ী আর দূরে জলজ্যান্ত ট্রেন। ওপাশের ১০তলা আধা আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিঙ্গের একটা বারান্দায় পাজামা হাটু পর্যন্ত গুটিয়ে রেখে এক ছেলে কানে হয়ত প্রেমিকা বা কোন রমণীর সাথে খাওয়াদাওয়ার আলাপ করছে অথবা আজকাল হয়ত প্রেমে ইচ্ছুকরা রাজনইতিক আলাপনেও সময় কাটান। তিনিও মাঝে মাঝে পিঠ চুলকাচ্ছে আর দূর থেকে অবস্থার বিবরণ দিচ্ছে। বিবরণটা বিরক্তির যথারীতি। কোন দিকে যাবার উপায় নেই। তরুন ছেলেমেয়েরা যারা রিক্সায় বসে ছিল ওই জটলার, তারা উতসুক হয়ে দূরে তাকিয়ে ট্রেনের দূরত্ব মাপার চেষ্টা করছে। অবস্থা বেগতিক।এর মধ্যে যে সবাই সমান আচরণ করবে সেটা নিতান্তই সিনেমাটিক ক্ল্পনা। বাস্তবে শ্লো মোশনের অপশন যেমন নেই, তেমনি নেই ডিরেকশনের সুযোগ, অন্তত খোলা ময়দানে। তাই কিছু লোক হতাশ চোখে তাকিয়ে দেখছে নিজের দেশের দূর্দশা। কানে ফোন নিয়ে একজনকে এবং আরো অনেককে পাওয়া গেল নিজেদের ঘটনা কিংবা অন্যকোন গুরুত্তপূর্ন বিষয়ে ব্যস্ত আলাপনে। পাশেই একটা সরাইখানা। মূলত ট্রাকচালকদের পদচারনায় মুখরিত। সেটার চারতলায় কোনার ঘরটার ঘোত ঘোত শব্দ নিচের কারো কানে না এলেও ওরাও শুন্তে পেল আতংকিত গুন গুন আর ট্রেনের চেনা সুর। ছেলেটা কিংবা মানুষটা মুখ উঠিয়ে একবার দেখবার চেষ্টা করল কি করলনা। হঠাত কিছু একটা ঘটে যাওয়ার উত্তেজনায় অপেক্ষমান ছুপড়ি ঘরের বাসিন্দারা উতসুক হয়ে চেয়ে রইল। একটা কিছু হলে মন্দ হতনা। কত কিছুইতো হয় আল্লাহর এই দুনিয়ায়। কিন্তু ওদের এখানে তো কিছু হয়না। বেশ একটা এক্সাইটিং ব্যাপার। রিয়েল লাইফ ক্লাইম্যাক্স। অবস্থা বেগতিক দেখে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও লাইনম্যান একটা মোটা লাঠি নিয়ে এসে দুচারটা রিকশা চালকের চাকায় বাড়ি মেরে ভাষার অলংকার হিসাবে গালি ব্যবহার করে তার বিরক্তির পরিমিতি বোঝাতে লাগল। হয়ত গুরুত্তপূর্ন ক্রসিং বলে একজন মেহেদি দেয়া দাড়িওয়ালা পুলিশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।। তিনিও এলেন। লাইনম্যান ভাই যিনি কিনা এই বিশৃঙ্খলার সব থেকে গুরুত্তপূর্ন এবং ক্ষমতাবান পদে অধিষ্ঠিত এবং সাথে তাঁর বন্ধু এবং সহকারী দাড়িতে মেহেদী লাগানো পুলিশ ভাই, দুজনকেই এই ভীড় দূরীকরনে বেশ আন্তরিক মনে হচ্ছে। কিন্তু শুধু আন্তরিকতাই সমস্যার সমাধা করে দিবে এমন আশা ক্ষীণ। আগেরটার থেকেও শ্লথ গতিতে অর্থাৎ শামুকদের মধ্যে অন্যতম যিনি, সেই ট্রেন এগিয়ে আসছে। কিন্তু রিলেটিভিটি প্রমান করছে- এর গতি বেশি। মানুষকি আতংকিত? কোন কারনে কি কেউ মৃত্যু ভয় পাচ্ছে? না। প্রশ্নই ওঠেনা। এ এক অদ্ভুত আশার নগরী । যারা ভুল বা রঙ সাইড দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছিল তাদেরকে দেখিয়ে ওপাশের এক রিকশাওয়ালা বার বার দেখিয়ে বলতে লাগল সব গুলারে উলটা পাঠান উস্তাদ, সব গুলারে উলটা পাঠান। এপাশের আরেক রিকশাওয়ালা নিজের কলিগকে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখে হতাশ হয়ে পড়ল। দার্শনিকের মত করে জানতে চাইল, আজকে তুমি এপাশে থাকলেও কি একই জিনিস চাইতা? গুরুত্তপূর্ন প্রশ্ন সন্দেহ নাই। ওপারের রিকশাওয়ালা এড়িয়ে যায়।

পেছন থেকে ইঁদুরের মত ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বাইক চালকদের অসহিস্নু হর্ন আসতে লাগল। একটু ছিদ্র বের করলেই তারা অনায়াসে ধুকে যাবে। কারু কোন ক্ষতি করবে এমন বাসনা তাদের নেই। তবে না ছাড়লে একটু আধটু হর্ন বাজাবে। ঝোকের মাথায় চুলে পাক ধরা এক আপাত বৃদ্ধ রিকশাওয়ালার মুখে কষে চড় বসিয়ে দিল চায়ের দোকানে বসা থাকা লোকটা। সেও আন্তরিক ভাবে চাচ্ছিল জ্যামটা খুলুক। দরকার হলে এই মরচে ধরা জ্যামে মোবিল ঢেলে দিবে। কিন্তু চড়টা মেরে ফেলেছে শখের বশে। হয়ত চড় মারা উনার পেশা। চড় খেয়ে বৃদ্ধ ছল ছল চোখে তাকিয়ে থাকল। নিমিষেই কত দৃশ্য কত কথা হঠাত মনে পড়ে গেল মধ্যবয়স পার করা বয়স্ক রিকশাওয়ালার। একেবারে কাজী সাহেবের কবিতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য। চোখে অপমান এবং ঘৃণা স্বাভাবিক ভাবেই দেখা দিল। কিন্তু যেটা দেখা গেলনা, সেটা হল একটা মিটারের কাটা। যেটাতে তার আর ওই লোকটার সামাজিক অবস্থানের পরিমাপ করে নিল অনায়াসে। ওদিকে ঝোকের মাথায় চড় মেরে কিছুটা অপ্রস্তুত লুঙ্গি আর স্ট্রাইপ দেয়া হাফ হাতা শার্ট পরা লোকটা কেন চড় মারল সেটার সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে লাগল। হঠাত চিৎকার করে উঠল চড় খাওয়া বৃদ্ধ, ' তোর উপর গজব পড়বে, তুই শেষ হয়ে যাবি, আল্লাহর গজব পড়বে তোর উপর.....' মুখের কথায় গজব আনতে পেরে বেশ তৃপ্তি পেল অপমানিত রিকশাওয়ালা। পাশের সি,এন,জি তে বসা ছেলেটার মাথায় একটা কবিতা ভর করল। কিংবা বলতে হয় কবিতা পেল। এক্ষুনি ফেসবুকে দেয়া দরকার। ইনশটাগ্রামের ফ্রেমটা আপাতত বাদ থাক।

আরে মেঘ তোমার বয়স কত?

আর কতকাল এভাবে এরিয়েল ভিউ এ দেখতে থাকবে আমাদের এই শহরটাকে?

এ শহরতো তোমারও

তুমি নাহয় আজ রাতে নেমে এস এই শহরে

এ শহরে কাঁক আছে, কিন্নরি আছে , কবির চোখে চশমা আছে?

গোলকধাঁধায় পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন আছে

তুমি তো দেখতেই পাও

মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ভেজাও

দেখতে দেখতে চারদিক ধোয়ায় ছেয়ে গেল। বোধহয় বৃষ্টিও হল। একটা বিড়ালছানা ডেকে উঠল। না কেউ শুন্তে পেলনা।এই হইহুল্লোড়ে নিজের গলার স্বরই শোনা গেলনা। চারদিকে কত রঙ দেখা গেল। শ্লথ গতির ট্রেনও চলে এল। হেডফোনে বাজতে থাকা গানগুলোও নেমে এল। কেউ কাদলনা, কে পালালনা। দেখতে দেখতে ফেসবুকে একশ একটা লাইক জমে গেল।

- আসিফ সালমান (মার্চ ২০১৯)

Featured Posts
Recent Posts
bottom of page